ধারাবাহিক মেহনত ও উস্তাদের দোয়া থাকলে ইলমের দৌলত অর্জিত হবে : মাওলানা হেদায়াতুল্লাহ কাসেমী
নিজস্ব প্রতিনিধি : ধারাবাহিক মেহনত, উস্তাদের সান্নিধ্য ও দোয়া এবং আসাতিযায়ে কেরামের নির্দেশনা মেনে চললে ইলমের দৌলত অর্জিত হবে। কোনো উস্তাদ কখনো কোনো ছাত্রের অমঙ্গল চান না। বাবা-মা যেমন সন্তানের কল্যাণ চান, তেমনি উস্তাদও তাঁর ছাত্রদের কল্যাণ কামনা করেন।
আজ বুধবার (২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ঈ.) বাদ মাগরিব জামিয়ার মসজিদে আয়োজিত বারিধারা জামিয়ার ছাত্রদের উদ্দেশ্যে এক তরবিয়তী আলোচনায় উপরোক্ত কথাগুলো বলেন, জামিয়ার নাজিমে তালীমাত ও শায়খুল হাদীস মাওলানা হেদায়াতুল্লাহ কাসেমী।
তিনি বলেন, হাদীসের সঙ্গে ধারাবাহিকভাবে লেগে থাকা হযরত আবু হুরায়রা (রা.)-কে ইলমের ক্ষেত্রে অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে গেছে। সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে তিনি সর্বাধিক হাদীস বর্ণনাকারীদের অন্যতম। রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর সাহচর্য লাভ এবং ইলম সংরক্ষণের প্রতি তাঁর গভীর আগ্রহই তাঁকে এ মর্যাদায় পৌঁছে দিয়েছে।
জামিয়ার সিনিয়র শিক্ষক মাওলানা জয়নাল আবেদীনের পরিচালনায় অনুষ্ঠিত তরবিয়তী মজলিসে সদরে ইজলাসের আলোচনায় তিনি এসব কথা বলেন।
মাওলানা হেদায়াতুল্লাহ কাসেমী বলেন, “ধারাবাহিক মেহনত ও উস্তাদের দোয়া থাকলে ইলমের দৌলত লাভ করা যাবে।”
তিনি বলেন, উস্তাদের দোয়া কখন আসবে? যখন উস্তাদের দেখানো পথে চলা এবং উস্তাদের সান্নিধ্য লাভের জন্য একজন তালিবে ইলম সদা-সর্বদা বেচাইন থাকবে। তখন উস্তাদ তার জন্য অন্তর থেকে দোয়া করবেন। যদি এমনভাবে চলা যায় যে, উস্তাদের অন্তর থেকে ছাত্রের জন্য দোয়া বেরিয়ে আসে এবং ছাত্র উস্তাদের দোয়া অর্জন করতে পারে, তাহলে সে সফলতা লাভ করতে পারবে—ইনশাআল্লাহ।
তিনি আরও বলেন, কোনো উস্তাদ কখনো কোনো ছাত্রের অমঙ্গল চান না। বাবা-মা যেমন সন্তানের কল্যাণ চান, তেমনি উস্তাদও তাঁর ছাত্রদের কল্যাণ কামনা করেন। এ কারণেই কখনো কখনো উস্তাদগণ ছাত্রদের প্রতি কঠোরতা অবলম্বন করেন। যারা এই কঠোরতাকে গণিমত মনে করে মেনে নেয় এবং উস্তাদের নির্দেশনা অনুযায়ী নিজেদের জীবন গড়ে তোলে, ফারাগাতের পর দেখা যায় তারাই বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে মুহাদ্দিস হয়ে নিজেদের উস্তাদদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে আসে। তখন উস্তাদদের কাছে তা অত্যন্ত আনন্দের বিষয় হয়ে দাঁড়ায় এবং সেই ছাত্রের জন্য অন্তর থেকে দোয়া আসে।
এ প্রসঙ্গে হযরত আবু হুরায়রা (রা.)-এর ইলম অর্জনের ঘটনা উল্লেখ করে তিনি বলেন, আবু হুরায়রা (রা.) রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর সঙ্গে এত বেশি লেগে থাকতেন যে, অন্যান্য সাহাবি যখন নিজেদের ব্যবসা-বাণিজ্য ও ক্ষেত-খামারের কাজে ব্যস্ত থাকতেন, তখন তিনি রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর সান্নিধ্যে উপস্থিত থাকতেন। ফলে অন্যরা যে সময় উপস্থিত থাকতে পারতেন না, তিনি সে সময়ের হাদীসও সংরক্ষণ করতে পারতেন।
হযরত আবু হুরায়রা (রা.) বলেন—
«إِنَّ إِخْوَانَنَا مِنَ الْمُهَاجِرِينَ كَانَ يَشْغَلُهُمُ الصَّفْقُ بِالْأَسْوَاقِ، وَإِنَّ إِخْوَانَنَا مِنَ الْأَنْصَارِ كَانَ يَشْغَلُهُمُ الْعَمَلُ فِي أَمْوَالِهِمْ، وَإِنَّ أَبَا هُرَيْرَةَ كَانَ يَلْزَمُ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ عَلَى مِلْءِ بَطْنِهِ، وَيَحْضُرُ مَا لَا يَحْضُرُونَ، وَيَحْفَظُ مَا لَا يَحْفَظُونَ.»
অর্থাৎ, “আমাদের মুহাজির ভাইদেরকে বাজারে কেনাবেচার কাজ ব্যস্ত রাখত এবং আমাদের আনসার ভাইদেরকে তাদের সম্পদ-সম্পত্তির কাজ ব্যস্ত রাখত। আর আবু হুরায়রা (রা.) পেট ভরে যাওয়ার মতো খাবারের বিনিময়ে রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর সঙ্গেই লেগে থাকতেন। ফলে তাঁরা যখন উপস্থিত থাকতে পারতেন না, তিনি উপস্থিত থাকতেন এবং তাঁরা যা সংরক্ষণ করতে পারতেন না, তিনি তা সংরক্ষণ করতেন।”
অন্য এক বর্ণনায় হযরত আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, তিনি রাসুলুল্লাহ ﷺ-কে বললেন—
«يَا رَسُولَ اللَّهِ، إِنِّي أَسْمَعُ مِنْكَ حَدِيثًا كَثِيرًا أَنْسَاهُ؟»
“হে আল্লাহর রাসুল! আমি আপনার কাছ থেকে অনেক হাদীস শুনি, কিন্তু সেগুলো ভুলে যাই।”
তখন রাসুলুল্লাহ ﷺ বললেন—
««ابْسُطْ رِدَاءَكَ»»
“তোমার চাদর বিছিয়ে দাও।”
তিনি চাদর বিছিয়ে দিলেন। রাসুলুল্লাহ ﷺ তাঁর দুই হাত দিয়ে তাতে কিছু নেওয়ার মতো করলেন। অতঃপর বললেন—
««ضُمَّهُ»»
“এটি তোমার বুকের সঙ্গে মিলিয়ে নাও।”
আবু হুরায়রা (রা.) বলেন—
«فَضَمَمْتُهُ، فَمَا نَسِيتُ شَيْئًا بَعْدَهُ.»
“আমি তা আমার বুকের সঙ্গে মিলিয়ে নিলাম। এরপর থেকে আমি আর কোনো কিছু ভুলিনি।”
এই হাদীসটি ইলম অর্জনের ক্ষেত্রে ধারাবাহিকতা, মনোযোগ, উস্তাদের সাহচর্য এবং অর্জিত ইলম সংরক্ষণের গুরুত্ব সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরে।
মাওলানা হেদায়াতুল্লাহ কাসেমী বলেন, তালিবুল ইলমকে ইলমের পথে ধৈর্য ও ধারাবাহিকতার সঙ্গে মেহনত করতে হবে। উস্তাদের নির্দেশনা ও নসিহতকে নিজের জন্য রহমত ও কল্যাণ মনে করতে হবে। যারা আসাতিযায়ে কেরামের নির্দেশনা মেনে চলবে এবং ইলমের সঙ্গে নিজেদের জীবনকে সম্পৃক্ত রাখবে, তারাই সফল তালিবুল ইলম হিসেবে গড়ে উঠবে।
তরবিয়তী মজলিসে আরও আলোচনা পেশ করেন জামিয়ার মুঈনে মুহতামিম মুফতি জাবের কাসেমী, মুহাদ্দিস মাওলানা মুফতি আবূ মূসা কাসেমী, মাওলানা হাবীবুর রহমান আকন্দ প্রমুখ।
মজলিসে জামিয়ার কিতাব বিভাগের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা উপস্থিত ছিলেন।
মন্তব্য (০)