দরসী উস্তাদই শুধু উস্তাদ নন—মাদরাসার প্রতিটি উস্তাদই আপনার উস্তাদ
।। মাওলানা আহমাদ বেলাল হাশিমি ।।
একবার নিজের কাছে প্রশ্ন করুন—আপনি কি শুধু যাঁর কাছে কিতাব পড়েন, তাঁকেই উস্তাদ মনে করেন? যাঁর কাছে প্রতিদিন দরস করেন, তাঁর সামনে আদবের সঙ্গে বসেন, তাঁর কথা মনোযোগ দিয়ে শোনেন—এটাই স্বাভাবিক।
কিন্তু একই মাদরাসার অন্য একজন উস্তাদ? তিনি যখন আপনার সামনে দিয়ে হেঁটে যান, তখন কি তাঁর প্রতিও আপনার সেই সম্মান থাকে? যদি না থাকে, তাহলে একটু থামুন। নিজেকে প্রশ্ন করুন—কোথাও কি আমাদের ভুল হয়ে যাচ্ছে?
প্রিয় তালিবুল ইলম ভাই!
আপনি আপনার দরসী উস্তাদকে যেভাবে মূল্যায়ন করেন, যেভাবে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন, মাদরাসার অন্যান্য উস্তাদকেও সেভাবেই মূল্যায়ন করুন। কারণ, মাদরাসা শুধু আপনার দরসী উস্তাদের নাম নয়। মাদরাসা একটি পরিবার। আর সেই পরিবারের প্রতিটি উস্তাদই আপনার জন্য সম্মানের পাত্র।
আমার একজন উস্তাদ একবার আমাদের বলেছিলেন—
“তোমার উস্তাদ তো উস্তাদই। তোমার উস্তাদের সমতুল্য—শিক্ষা, মর্যাদা ও মানের দিক থেকে—অথবা তোমার উস্তাদের বয়সী যারা আছেন, তাঁরাও তোমার উস্তাদ।”
কথাটি ছোট। কিন্তু এর ভেতরে একজন তালিবুল ইলমের জীবনের জন্য বিশাল শিক্ষা রয়েছে।
আরেকজন উস্তাদ বলেছিলেন—
“তুমি যে মাদরাসায় দরস নিচ্ছো, সেই মাদরাসার স্টাফদের সঙ্গেও ভদ্র আচরণ করো। এমনকি মাদরাসার বাবুর্চি, দারোয়ান ও ঝাড়ুদার—তাঁরাও তোমার অভিভাবক।”
কেন?
কারণ আপনি যখন কিতাব খুলে বসেন, তখন শুধু একজন উস্তাদ আপনার পাশে থাকেন না। আপনার ইলমের পথটি সহজ করতে আরও অনেক মানুষ নীরবে খেদমত করে যাচ্ছেন।
কেউ আপনার খাবার রান্না করছেন।
কেউ মাদরাসার পাহারা দিচ্ছেন।
কেউ আপনার চারপাশ পরিষ্কার করছেন।
কেউ আপনার জন্য একটি সুন্দর পরিবেশ তৈরি করে দিচ্ছেন।
আপনি হয়তো তাঁদের কাজ দেখছেন, কিন্তু তাঁদের খেদমতের মূল্যটা কি উপলব্ধি করছেন?
মনে রাখবেন—
কোনো হালাল খেদমত ছোট নয়। কোনো খেদমতকারী মানুষ তুচ্ছ নয়।
আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা—
আজ যাঁকে আপনি ‘দরসী উস্তাদ নন’ বলে অবমূল্যায়ন করছেন, কাল হয়তো তিনিই আপনার দরসী উস্তাদ হয়ে যেতে পারেন!
আজ তিনি আপনার কিতাবের উস্তাদ নন।
কিন্তু কাল? হয়তো তাঁর কাছেই আপনাকে বসতে হবে। হয়তো তাঁর কাছ থেকেই আপনাকে কোনো গুরুত্বপূর্ণ ইলম শিখতে হবে। তাহলে আজই তাঁকে সম্মান করতে সমস্যা কোথায়?
প্রিয় তালিবুল ইলম ভাই!
আপনি যে মাদরাসার ছাত্র, সেই মাদরাসার প্রতিটি উস্তাদকে নিজের উস্তাদের মতো সম্মান করুন। কাউকে ছোট করে দেখবেন না। অবমূল্যায়ণ করবেন না। এতে সে উস্তাদের কোনো ক্ষতি হবে না। বরং ক্ষতিটা আপনারই। কোনো উস্তাদকে শুধু এই কারণে অবমূল্যায়ন করবেন না যে, তিনি আপনাকে বর্তমানে কোনো কিতাব পড়াচ্ছেন না।
কারণ—
“ইলমের সৌন্দর্য শুধু কিতাব পড়ায় নয়; ইলমের আসল সৌন্দর্য ফুটে ওঠে আদব ও আখলাকে।”
আর মনে রাখবেন—
“যে তালিবুল ইলম উস্তাদের মর্যাদা বোঝে না, সে ইলমের মর্যাদাও পুরোপুরি বুঝতে পারেনি।”
তাই আসুন—
কিতাবের সঙ্গে আদব শিখি।
দরসের সঙ্গে বিনয় শিখি।
ইলমের সঙ্গে উস্তাদের সম্মান শিখি।
আজ থেকেই সিদ্ধান্ত নিই—
আমার দরসী উস্তাদ যেমন সম্মানের,
মাদরাসার অন্য উস্তাদও তেমনই সম্মানের।
যিনি আমাকে পড়ান, তিনি আমার উস্তাদ।
আর যিনি আমার ইলমের পরিবেশ গড়ে তুলতে খেদমত করেন, তিনিও আমার শ্রদ্ধার পাত্র।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে উস্তাদদের যথাযথ মর্যাদা বোঝার, তাঁদের সম্মান করার এবং ইলমের সঙ্গে আদবকে জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ বানানোর তাওফিক দান করুন। আল্লাহ পাক আমাদের ছহীহ বুঝ দান করুন। আমিন।
লেখক : যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী আলেম, চিন্তক ও গবেষক।
মন্তব্য (০)